November ৩০, ২০২৫
তুলো চাষীর বউ
গল্প

আপনার মতামত দিন

0
0

তুলো চাষীর বউ

মেঘমালা
Friday, August 15, 2025

আমি তখন এলাহাবাদে। উত্তর প্রদেশ সরকারের কৃষি বিভাগে চাকরী করি। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে এলাহাবাদ চলে গেছিলাম কৃষিবিজ্ঞানে বিএসসি পড়ার জন্য। অসমে এমন কোনো সুযোগ ছিল না। তারপর এগ্রি বিএসসি পাশ করে সেখানেই মাস্টার্স করি। বাবার পাঠানো টাকা আর আমার পার্ট টাইম একটা কাজ থেকে খানিকটা আয় – এই দুই মিলিয়ে বেশ চলে যাচ্ছিল। পার্ট টাইম কাজ বলতে এমন কিছু নয়। একটা দোকানে খাতা লেখার কাজ। আর মাঝে মাঝে মালিকের ফুট ফরমাস খাটা। মাসে মাসে কিছু টাকা ছাড়াও আর একটা লাভ ছিল। হিন্দিটা শেখা হতো একটু একটু করে। মালিকও এই বাঙালি বাবুর হিন্দির জন্য যেমন ঠাট্টা করত, তেমনি আবার খুবই স্নেহ করত। মাঝে মাঝে তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করে খাওয়াত আমাকে।

এভাবেই দুবছর কেটে যাওয়ার পর মাস্টার্স কমপ্লিট হয়ে গেল। বেশ ভাল ফল করলাম। এবার ঘরে ফেরার পালা। বাড়ি গিয়ে চাকরীর চেষ্টা করতে হবে। বাবার পাশে দাঁড়াতে হবে।

কিন্তু বাদ সাধলেন সেই দোকানের মালিক। বোধহয় আমার উপর বেচারার বেশ ভালই একটা মায়া জন্মে গেছিল। আমাকে বললেন, এখানে চাকরী পেলে থেকে যাব কিনা। আমি ভাবলাম, ব্যাটা নিশ্চই আমার সঙ্গে ওঁর মেয়ের বিয়ে দেবার মতলবে আছে। মনে মনে অবশ্য খুশীই হলাম। আমি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলাম। ওই মেয়েকে বিয়ে করার জন্য নয়, চাকরীর লোভে।

তবে মেয়েটা দেখতে তেমন কিছু সুশ্রী না হলেও মোটেই মন্দ ছিল না। তখন বয়স কম। মেয়েদের রূপ ছাড়া যে আরও অনেক কিছু আছে সেসব বুঝি না। মেয়েটার সঙ্গে বেশ বন্ধুত্বও হয়েছিল। কিন্তু প্রেম বলতে যা বোঝায় তার বিন্দুমাত্রও কিছু হয়নি।

কী করে যে কী হল কিছু বুঝে উঠবার আগেই আমি চাকরী পেয়ে গেলাম কৃষি দপ্তরে। সেই মালিক একদিন বললেন সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে একজনের সঙ্গে দেখা করতে। দেখা করলাম। পরদিন সেই ভদ্রলোক ফোন করে বললেন অমুক দিনে কাজে জয়েন করতে।

এভাবেও চাকরী হয়? মাস্টার ডিগ্রির ফল বেরোবার এক মাসের মধ্যে এমন ভাল চাকরী? আমি মিষ্টি আর ফল নিয়ে তৎক্ষণাৎ দৌড়। মালিককে গিয়ে জানাতে বললেন, "জানি, আমাকে তোমার বস ফোন করে বলেছেন!"

বেশ চলছিল। দেখতে দেখতে তিন বছর কেটে গেল। এরই মাঝে দুবার প্রমোশন পেয়ে টাকার অঙ্ক নয় শুধু, প্রেস্টিজ-ও সঙ্গে বেশ বেড়ে গেছিল। দুঃখের যা সেটা হল, মালিক ওঁর মেয়েকে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়ে দিলেন। আমি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি, উনি মেয়ের জন্য আমার কথা একবারও ভেবে দেখবেন না। এ যেন বাপ-বেটিতে ষড়যন্ত্র করে আমায় কষ্ট দেওয়া!  আমার তো অন্তত তাই মনে ঠেকল। আমি অবশ্য দামী উপহার সঙ্গে নিয়ে গিয়ে পেট পুরে খেয়ে সেই কষ্টের বেশ খানিকটা লাঘব করে এলাম।

দিন চলে যাচ্ছিল। একঘেয়ে হলেও দিন চলে যাচ্ছিল যেমন যায়। মাঝে মাঝে শুধু মায়ের উৎপাত বিয়ের জন্য। আমি তখন আরও উপরে ওঠার নেশায় মত্ত। বছরে দুবার করে বাড়ি যাই। কয়েকদিন থেকেই ফিরে আসি। মন আনচান করে এলাহাবাদের জন্য। বিয়ে টিয়ে এখন নয়।

হঠাৎ একদিন অফিসে একটা ছেলে জয়েন করল। দেখে বেশ চেনা চেনা লাগছে খুব। নামটাও বাঙালি বাঙালি লাগছে। কিন্তু বোঝা দায়। জিগেশ করতেও সঙ্কোচ হচ্ছে। কী না কী ভেবে বসে। তার উপর অফিসে আমার একটা পদমর্যাদার ব্যাপার আছে। উল্টে খানিকটা ভয়ও পেতে পারে মাঝখান থেকে। তাই আর এই নিয়ে মাথা ঘামালাম না।

অফিসে ঢোকার পথে বিরাট একটা গেট আছে। বেশ বড়সড় অফিস আমাদের। খুবই সুন্দর দেখতে। শুনেছি, কোনও এক কালে এটা নাকি রাজবাড়ি ছিল। মেইন গেটটা পেরিয়ে খানিকটা হাঁটতে হয়। হঠাৎ একদিন অজয় এসে বলল, "স্যার, আপনি আমাকে চিনতে পারেননি, কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। আমরা একই স্কুলে পড়তাম।"

অজয় হল সেই ছেলেটা যে নতুন জয়েন করেছে। কথা হল। এবার আমিও বুঝতে পারলাম, কেন তাকে চেনা চেনা লাগছিল। সে আমার দুই ক্লাস নিচে পড়ত। স্কুলে দেখতাম। কিন্তু কখনই কথা হয়নি ওর সঙ্গে।

অজয়কে পেয়ে বেশ ভালো কাটছিল দিনগুলো। একই অফিসে দুজন বাঙালি! বাঙালির যতই বদনাম থাকুক, সামান্য হলেও টান তো থাকবেই। প্রতি রবিবারে দুজনে কোথাও না কোথাও যাই। অফিসের নানা ব্যাপার আমি ওকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে দিই। দুজনেই ব্যাচেলার। দুজনেই বাঙালি রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করি। এভাবেই দিন যাচ্ছিল।

একদিন অফিসে একটা ঘটনা ঘটল যা অজয় একেবারেই আশা করেনি। বেচারা ঘাবড়ে গিয়ে চীৎকার শুরু করে দেয়। মাত্র তিনমাস মতো হয়েছে ও জয়েন করেছে কাজে। তখনও শিখছে সব কিছু। আমি থাকাতে যা একটু সুবিধে।

প্রায়ই একটি মেয়ে আসত অফিসে। 'তুলো চাষীর বউ' নামেই সবাই  চিনত তাকে। ওর স্বামীকে খুঁজতে আসত। পিছনে একটা করুণ কাহিনী আছে। সবাই জানত। তাই কেউই ওকে কিছু বলত না। অফিসের সামনের ঘরেই বসে থাকত। ভেতরে কখনো যেত না। সামনে যাকে পেত জিগেশ করত, "আমার স্বামীকে দেখেছ? খবর করতে পেরেছ তার? জানো, কেউ আমার স্বামীকে লুকিয়ে রেখেছে!"

সামনের অফিসে একদিন মেয়েটা বসে আছে। অজয় কি একটা কাজে সেখানে এসেছে। অজয় কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটা অজয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মেয়েটা চীৎকার করতে থাকে, "এই তুমি, তুমি আমার স্বামীকে লুকিয়ে রেখেছ! বলো কোথায় ও, বলো!"

অজয় মাটিতে পড়ে গিয়ে ভয়ে চীৎকার করতে থাকে। কাছাকাছি যারা ছিল, সবাই দুজনকে ছাড়িয়ে অজয়কে ভিতরে নিয়ে যায়। ততক্ষণে আমার ডাক এসে গেছে। গিয়ে দেখি, অজয় থরথর করে কাঁপছে। আমি ওকে জল-টল খাইয়ে শান্ত করে বললাম, "ভয় পাস্ না। মেয়েটার মাথায় একটু গোলমাল আছে। দুঃখের জীবন! তোকে দেখে অন্য কেউ ভেবে এমনটা করে বসেছে। আগামী রোববার তোকে সব বলব। এখন বাড়ি চলে যা। আমি বসকে বলে দিচ্ছি।"

অজয়ের সঙ্গে আমার তখন তুই আর তুমির সম্পর্ক। আমি ওকে তুই করে বলি। অজয় আমাকে তুমি বলে। একটা অদ্ভুত ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আমাদের মধ্যে। আসলে, বিদেশে আমাদের আপন বলতে আর কেউ নেই। তাই কখন জানি দুজন দুজনকে দেখাশোনার ভার নিয়ে বসেছ!

অফিস থেকে বাড়ি ফিরেই অজয়কে ফোন করি। বেচারার একটু জ্বর-জ্বর বোধ হচ্ছে। বোধহয় ভয় থেকেই এমনটা হয়েছে। আমি ওকে আস্বস্ত করে বলি, দুদিন যেন অফিসে না আসে। দুদিন বাদেই তো রোববার। আমি বসকে বলে অফিসে ম্যানেজ করে নেব। আর বেশী শরীর খারাপ হলে আমাকে যেন ফোন করে। রোববারে যাব দেখতে।

রোববারে যথারীতি অজয়ের কাছে গেলাম। বেচারা একেবারেই মুষড়ে পড়েছে! আমাকে দেখে যেন একটু ভরসা পেল। প্রথমেই জিগেশ করল, "এত লোক থাকতে আমাকে কেন? আমি কী করলাম বলো?"

আমি হাসতে হাসতে বললাম, "তুই কিছু করিসনি। তোর কোনো দোষ নেই। দোষ তোর গায়ের ধবধবে ফর্সা রঙের! আমি কালো বলে ও আমাকে তাড়া করে না।"

অজয় অবাক হয়ে বলল, "মানে? কীসব আবোল তাবোল বলছ? হেঁয়ালি রাখো। সত্যি করে বলো তো মেয়েটির সব কথা। ওর মাথাটাই বা খারাপ হল কেন?"

আমি ওকে ধীরে ধীরে সব বললাম। সব মানে ওই যতটুকু শুনেছি ততটুকু। আমিও কি সবটা জানি ছাই! মেয়েটার স্বামী আর ও মিলে চাষ করত। তুলো চাষ। নিজেদের জমিতে। বিয়ে হয়েছিল বছর তিনেক। বাচ্চা হয়নি তখনো। দুজনে মিলে বেশ সুখেই নাকি ছিল। ছোট চাষী। আয় তেমন না হলেও দুজনের সংসার হেসে খেলে চলে যেত! হঠাৎ সব বদলে গেল। অ্যামেরিকা না কি ইওরোপ থেকে একজন সাদা চামড়ার লোক এসে কৃষি বিভাগের সঙ্গে কথা বলে তুলো চাষ বন্ধ করে দেয়। চাষিদের বলা হল অন্য কিছুর চাষ করতে। এই নিয়ে ঝামেলা বাঁধে। ওই মেয়েটার স্বামী প্রতিবাদ করে। ও সবাইকে দলবদ্ধ করে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। সেটাই শেষে কাল হল। হঠাৎ একদিন মেয়েটার স্বামী গুম হয়ে গেল। কেউ আর তাকে দেখেনি। সেই থেকে মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আর সেই থেকে ফর্সা লোক দেখলেই ক্ষেপে যায়। ভাবে, এই বুঝি সেই সাদা লোকটা যে আসার পর তুলো চাষ নিয়ে গন্ডগোল বেঁধেছিল। ও ভাবে, সেই লোকটাই ওর স্বামীকে লুকিয়ে রেখেছে।

অজয় সব শুনে থ বনে যায়। আমাকে খুব শান্ত স্বরে বলে, "বায়োটেক নিয়ে কী সব ঝামেলা হয়েছিল। কাগজে দেখেছিলাম। বীজ নিয়ে কী সব করতে চেয়েছিল বিদেশী একটা কম্পেনি। ভাবছি, এটাই কি সেই ঘটনা নাকি!"

অজয় খুব সাহসী। ও আমার মতো নয়। কৌতূহলীও। ওর সঙ্গে আমার আর প্রতি রোববার এখানে সেখানে যাওয়া হয় না। অফিসের বাইরে দেখাও হয় না আগের মতো। দেখা হলেও রবিবার রাতের বেলায় কিছুক্ষণের জন্য। একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া শুধু। ওই টুকুনই। সে প্রতি রবিবার টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। কিছু জিগেশ করলে বলে, "সব বলব একদিন। আগে সব তথ্য জোগাড় করে নিই!"

আমি ওকে সাবধান করি, "অজয়, যাই করিস নna ken এমন কিছু করিস না যাতে বাঙালির দুর্নাম হয়। তাছাড়া খানিকটা ভয়ের ব্যাপারও তো আছে বল। এটা আমাদের বিদেশ বাড়ি। বিপদে পড়লে কেউ রক্ষা করার নেই!"

অজয় আমাকে অভয় দেয়।

এর মধ্যে আমি আরও একটা ছোট প্রমোশন পেয়ে সিঁড়ির আরো এক ধাপ উপরে উঠে গেছি। অজয়ের সঙ্গে কথা হয় মাঝে মাঝে। কিন্তু সেই আগের মতো অফিসের বাইরে ঘন ঘন দেখা, রান্না করা, খাওয়া, বেড়াতে যাওয়া, ইত্যাদি হয়ে উঠে না। ওর একটা নিজস্ব জগৎ গড়ে তুলেছে। বুঝতে পারি। তাই ওকেও আর বিব্রত করি না।

চোখ ছানাবড়া হল সেদিন যেদিন ওকে দেখলাম অফিসে তুলো চাষীর বৌকে নিয়ে এল!

কী ব্যাপার! সবাই তো চমকে গেল ওদের দেখে। আরও বেশী অবাক হল সবাই যখন দেখল সেই মেয়েটা যাকে সবাই তুলো চাষীর বৌ বলে জানত, একেবারেই বদলে গেছে। সবার সঙ্গে হাসছে, কথা বলছে। আগের মতো সেই পাগলামির বিন্দুমাত্র কিছুই নেই তার চোখে মুখে।

সবাই খুশি হলেও অফিসের এক বড় বাবুকে একটু যেন বিরক্ত বা চিন্তিত দেখলাম। কেমন জানি সন্দেহ হল। বুঝলাম না প্রায় কিছুই।

দুদিন পর রবিবারে অজয়ের বাড়ি গেলাম। আগেই কথা ছিল দুজনে আগের মতো রান্না-বান্না করে খাওয়া দাওয়া করব।

কথায় কথায় অজয়কে জিগেশ করলাম তুলো চাষীর বৌয়ের কথা। ওর এমন পরিবর্তনের পিছনের রহস্যটা জানতে চাইলাম।

অজয় বলল, "তোমাকে সবটা বলব না আজ। আরও একটু কাজ বাকি আছে। তবে একটু বলি। বিদেশী কম্পেনির সঙ্গে সরকারি অফিসের কিছু কর্মকর্তা মিলেমিশে তুলোর বীজের স্বত্ব বিক্রি করে দিয়েছে। প্রায় দেড়শ চাষী এর ফলে মার খেয়েছে। সেই থেকেই সর্বনাশের শুরু। কারা কারা যুক্ত ছিলেন তাদের সবার নাম আছে আমার কাছে। কিন্তু হাতে প্রমাণ নেই। সেটাও এসে যাবে কয়েক দিনের মধ্যে। তখন তোমাকে বিস্তারিত বলব। আর এই মেয়েটা যাকে তোমরা তুলো চাষীর বৌ বলে জানো অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে ওকে আমি মনোবিদের কাছে নিয়ে গেছি । আর এক চাষী পরিবারের সাহায্য নিয়েছি। অনেক কষ্ট করে ওর বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।"

স্তম্ভিত হয়ে জিগেশ করলাম, "সব কিছু জেনে নিয়ে, প্রমাণ হাতে নিয়ে কী করবি? তুই কি সব ফাঁস করে দিবি? জানিস তোর চাকরী তাহলে আর নাও থাকতে পারে? তার চেয়েও বড় কথা হল, এর ফলে তোর জীবনও বিপন্ন হতে পারে!"

অজয় হাসল, "জানি। তাই ঠিক কী করব বা কীভাবে করব এখনো জানি না। শুধু এতটুকু জানি, আমি কিছু একটা করে ছাড়ব। আমি তোমাদের তুলো চাষীর বৌকে কথা দিয়েছি!"

(পূর্বে প্রকাশিত, 'ঋ এবং' - অগাস্ট ২০২৪)