বই। একটি মাত্র শব্দ। কিন্তু এর আক্ষরিক অর্থ গভীর সাগরের অতলের মতোই সু-বৃহৎ। যুগ যুগ কেটে গেলেও বই পড়া মানুষের কিন্তু বন্ধ হয়নি। পরিবর্তন হয়েছে মতাদর্শের, পরিবর্তন হয়েছে প্রকৃত শিক্ষার। পরিবর্তন হয়েছে ভাব-চেতনার। একজন ব্যক্তির মানসিক পরিবর্তন ঘটাতে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। শুধুমাত্র পড়ার বই পড়লে প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। এ প্রসঙ্গে বিবেকানন্দ বলেছেন,"মাথায় কতগুলো তথ্য ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, সেগুলো হজম না হয়ে চিরকাল এলোমেলো বিশৃঙ্খলভাবে সেখানে ঘুরপাক খেতে লাগলো, একে শিক্ষা বলে না। মানুষের ভিতর যে পূর্ণ প্রথম থেকেই রয়েছে, তারই প্রকাশ সাধনকে বলে শিক্ষা। যাতে character form (চরিত্র তৈরি) হয়, মনের শক্তি বাড়ে, বুদ্ধির বিকাশ হয়, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, এই রকম শিক্ষা চাই।" আবার প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেছেন,"আমাদের দেশের শিক্ষা বিশেষত বৈজ্ঞানিক শিক্ষা-যে তাদৃশ ফলপ্রদায়ক হয় না, তাহার প্রধান কারণ এই যে আমাদের অর্জিত বিদ্যা কেমন পুস্তকগত। শিক্ষক যে ভ্রান্ত প্রণালীতে স্বয়ং শিক্ষিত হইয়াছেন, ছাএকেও সেই প্রণালীতে অনুসরণ করিয়া শিক্ষাদান করেন-কতকগুলি শুষ্ক, নীরস সূত্র (Dry Formulae) ছাত্রের গলাধঃকরণ করাইতে পারিলেই শ্রমের সার্থকতা জ্ঞান করেন। ছাত্র আবার যাহা কণ্ঠস্থ করিয়াছে, তাহা পরীক্ষা-কালে প্রশ্নোত্তরে উগরাইতে (Vomit) পারিলেই আমরা ধরিয়া লই যে সে বিদ্যা শিক্ষার যথেষ্ট পরিচয় দিল।
এই দুটি বক্তব্যকে আমি আমার জীবনে যথার্থ বলে মনে করি। প্রকৃত শিক্ষা অন্তর থেকে আসে,পুঁথি-পাঠ করে কিংবা মুখস্থ করে আসে না।
বর্তমান সমাজকে যতই দেখি বিস্মিত হয়ে যাই, অথচ একটু আগের জেনারেশন এই দুটোকে যদি মেলাতে যাই তাহলে বিরাট সাগরের ব্যবধান লক্ষ্যনীয়। একটা সময় ছিল যখন কোনো তথ্যের প্রয়োজন পড়ত, তখন মানুষ বইয়ের সাহায্য নিত। বই ছিল জ্ঞানের প্রকৃত ভান্ডার। কিন্তু এখন কোনো তথ্যের প্রয়োজন পড়লে মোবাইল খুলে গুগল এ দেখি। এতে আমরা আংশিক তথ্য পেয়ে থাকি। কিন্তু প্রকৃত তথ্য এবং সুদীর্ঘ তথ্য পাওয়া যাবে কি? এর উত্তর হলো, না। আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি বইয়ের থেকে বড় বন্ধু এ পৃথিবীতে সত্যিই দুর্লভ। বই হল কয়লা খনির মতো তথ্যের ভাণ্ডার। এখনকার সমাজের বই পড়তে খুব অনীহা। প্রথমত, তাদের মধ্যে ধৈর্য খুব কম। যখনই একটা বড় কোনো লেখা পড়তে দেওয়া হয়, তখন লক্ষ্য করবেন এই আজ পড়ব, কাল পড়ব করে কাটিয়ে দেয়। তাদের পড়তেই ইচ্ছে করে না। এর মূল কারণটা হলো মোবাইল ফোন। মোবাইলে মানুষ স্ক্রীন স্ক্রোল করে, সেইজন্য আর বই পড়তে ইচ্ছে করে না। আপনি লক্ষ্য করবেন যে মানুষ ফেসবুকে কেউ আজকাল অনীহা! মাত্র ১৫ সেকেন্ডের রিলস, এটাও মানুষের দেখতে অধৈর্য। বড়জোর ১০ সেকেন্ড দেখেই স্ক্রীন স্ক্রোল করতে থাকে। অর্থাৎ ধৈর্য শক্তির হ্রাস হওয়ার মূল কারণ হলো সেই মোবাইল ফোন। এছাড়া আমি এখনো সন্দিহান যুব সমাজ আদৌ কতটুকু বই পড়ে? বইমেলা তো প্রতি বছর হয়। লক্ষ লক্ষ পাঠকের ঢল নামে বইমেলায়। গ্রন্থাগার মন্ত্রীর হিসেব মতো বই বিক্রিও কোটি কোটি টাকার কম নয়। না, কথাটি মিথ্যে নয়, যদি বই বিক্রি নাই হতো, তাহলে এত প্রকাশক কি দিন-রাত এক করে স্টল সাজাতেন? কিন্তু প্রশ্ন হলো বই বিক্রি হলেও মানুষ কতটুকু বই পড়ে? ওই শোকেসে, আলমারিতে বই সাজিয়ে রাখেন তারা। খুব জোর প্রথম পাতা টুকু খুলে কষ্ট করে একটু পড়ে বইগুলো গুছিয়ে সাজিয়ে দেন। তাই আমার মতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সার্ভে করা উচিত, অন্যান্য বিষয়ের মতো। কে,কতটুকু বই পড়ছেন! আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, এই যে এত কবি-সাহিত্যিক বাংলা ভাষায় এত সৃষ্টি করে গেছেন। সেই সৃষ্টিগুলো করেছেন কাদের উদ্দেশ্যে? পাঠকদের অর্থাৎ আমাদের উদ্দেশ্যে, তাই তো? কিন্তু সেই সমস্ত সৃষ্টির মর্যাদা আমরা দিচ্ছি না। মনে রাখতে হবে, বাংলা ভাষা এমন একটি ভাষা যে ভাষায় সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল রচনা প্রকাশিত হয়েছে। যতই ইংরেজি সাহিত্যে হাজারও গল্প-কবিতা প্রকাশিত হোক না কেন, ভাষার জননী আমাদের বাংলা ভাষাই। এত মধুর শব্দ অন্য কোনো ভাষায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। জীবনে যদি রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দ সুভাষচন্দ্র-কাজী নজরুল ইসলাম, এঁনাদের সম্পর্কে না পড়া হলো বা এঁদের সৃষ্টি নাই পড়া হলো, তাহলে কী জন্য বাঙালি হওয়া? শুধুই প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি এর দিন শহীদ স্মরণ করার জন্য? আর জীবন গড়তে হলে বই পড়াই প্রয়োজন। বই পড়া, তার সুঘ্রাণ নাকে এসে লাগা, এগুলো যদি কেউ নাই পেল, তাহলে আমি মনে করি তার মানুষ জন্ম সত্যিই বৃথা! শুনতে খারাপ লাগলে এটাই ধ্রুব সত্য। আর পাঠ্য পুস্তকের ওই সীমিত সংখ্যক সিলেবাসের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত না করে, ভিন্ন দশটি বই পড়ে নিজেকে মানুষের মত মানুষ তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। মানুষ এখন গ্রন্থাগারে যায় না, বই পড়ে না। শুধু মোবাইলে কতগুলো ডিজিটাল বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে চ্যাটিং এ ব্যস্ত! এটাই কি জীবন? অনেকেই ব্যস্ততার অজুহাত দেখান, আমার মতে পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যিনি ব্যস্ত নন! এই ব্যস্ততাকে সঙ্গী করে সময় বের করে বই পড়তে হবে। এখনকার যুব সমাজ বা ছাত্র সমাজ রবীন্দ্রনাথকে ভুলতে বসেছে। শুধুই ২৫ শে বৈশাখ শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়া! এটা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা নয়। এটা একজন বাঙালি হিসেবে অত্যন্ত লজ্জার। লক্ষ্য করবেন বর্তমান দিনে মানুষে মানুষে অত্যন্ত হিংসা, জটিলতা এগুলো অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এগুলোর মূল কারণ হলো একটিই, বই না পড়া। একজন শিক্ষিত, ভদ্র, নম্র মানুষ গড়ে তুলতে হলে নিজেকে বই পড়তে হবে। এখন দেখি ই-বুক এ মানুষ সব করে ফেলছেন। আমার মতে চোখকে কষ্ট দিয়ে ওই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হরফগুলোকে না পড়ে, ছাপা বই পড়ুন। প্রতিভা বসুর কথায়,"বই হলো শ্রেষ্ঠ আত্মীয়। যে আত্মীয়ের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ ঘটে না।" সত্যিই তাই বই প্রকৃত বন্ধু, আত্মীয়। বইয়ের পাতা হলদেটে হয়ে গেলেও বই হল চির যৌবন। বইয়ের বয়স বাড়ে না। আসলে এখনকার বাবা-মায়েরা সন্তানদের বই পড়তে বলেন না বা আগ্রহ দেখান না। একটা শিশুর ভীত গড়ে ওঠে শৈশব থেকে। শৈশব থেকে তার মধ্যে যদি বই পড়ার আগ্রহ বা অভ্যাস তৈরি করানো যায়, তাহলে সে সারাজীবন বইকে চিরসঙ্গী করে তুলবে। এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সাহিত্যের নক্ষত্রখচিত তারকা যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, জীবনানন্দ দাশ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ দেরকে আগামী প্রজন্ম ভুলতে বসেছে। বর্তমান সময়ে মানুষ যদি এতই বই পড়েন, তাহলে গ্রন্থাগারগুলোর আজ এই অবস্থা কেন? পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ২৩৫৬ টি গ্রন্থাগারের মধ্যে অধিকাংশ গ্রন্থাগারে গ্রন্থাগারিক নেই। লাইব্রেরী শব্দটিকেও মানুষ ভুলতে বসেছে। কেউ লাইব্রেরি যায় না। তারপর স্কুলে লাইব্রেরি ক্লাসে আমি নিজে লক্ষ্য করেছি যে তারা সাহিত্যের কোনো বই ছোঁয় না। রসায়নের বই গ্রহণ করে, যেখানে ক্যারিয়ার তৈরি করে। বোধহয় আমাদের স্কুলে আমিই একমাত্র স্টুডেন্ট, যে সাহিত্যের পাশে ও সাহিত্যের সাথে সর্বদা রয়েছে। তাই আমাদের এখনো এই বসুন্ধরাকে বাঁচাতে হলে বই পড়তেই হবে। বইয়ের বিকল্প বই, ই-বুক বা মোবাইল ফোন নয়। একটা দেশের যুবসমাজ আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদের ইঙ্গিতই আগামী জেনারেশন। তাই আমি এই যুব সমাজকে করজোড়ে অনুরোধ করবো, ফেসবুকে চটুল রিলস না দেখে প্রয়োজন ব্যতীত মোবাইল ফোন ব্যবহার না করে বই পড়। প্রথমটা মানিয়ে নিতে অসুবিধা হবে ঠিকই, কিন্তু আস্তে আস্তে সবটাই ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের অঙ্গীকার বদ্ধ হতে হবে, বই পড়ো জীবন গড়। পরিবর্তন আসবেই। এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস ও সংকল্প। বইয়ের বিকল্প যে বই-ই!