স্টেশনে নামতে না নামতেই লোডশেডিং! বিরক্তিতে মুখটা বিষিয়ে গেল মৌলমীর।দোকানগুলোতে মোমবাতি, হ্যাজাক, হ্যারিকেন জ্বালানোর হিড়িক পড়ে গেল। কিছুক্ষণ স্টেশনেই দাঁড়িয়ে রইল মৌলমী।
ধীরে ধীরে অন্ধকারও চোখে সয়ে যায়। আবছা আলোতে আশেপাশের রাস্তা দোকানপাট বেশ স্পষ্টই যেন অনুভূত হয়। মৌলমী হাঁটতে থাকে। দেখা যাক একটা অটো যদি পাওয়া যায়। এই অন্ধকারে তো আর হেঁটে বাড়ি যাওয়া যাবে না!
কিন্তু না, একটাও অটো নেই। মরতে গেছে সব। দরকারের সময় ওগুলোকে কখনো পাওয়া যায় না। মৌলমী দেখল দুটো রিক্শা
দাঁড়িয়ে আছে। পাদানিতে চালক দুজন বসে আছে। চেহারা স্পষ্ট না দেখা গেলেও মৌলমী বুঝতে পারে একজন প্রৌঢ় আর একজন সাতাশ-আঠাশ বছরের যুবক। মৌলমী খুব ধীরে ধীরে প্রৌঢ়ের কাছে গিয়ে জিগেশ করে, "আমার সঙ্গে যাবেন? আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবেন?"
প্রৌঢ় উঠে গিয়ে বলে, "উঠুন।"
মৌলমী ঠিক কী বলবে ভেবে পায় না। আস্তে আস্তে বলে, " না, মানে। আমাকে টানতে হবে না। আমার সঙ্গে সঙ্গে গেলেই যথেষ্ট। আমি পাশেই থাকব। আপনার সঙ্গে হেঁটে হেঁটে যাব!"
সেই প্রৌঢ় তখন বিরক্ত হয়ে জিগেশ করে, "এর মানে কী দিদিভাই? আপনি পাশে থাকবেন। আমার রিক্শায় উঠবেন না। কেন, আমার রিক্শা কি এতই খারাপ? আপনি বরং ওকে নিন!"
পাশে থাকা সেই যুবক কেমন যেন একটা অসভ্যের মত হেসে ওঠে। মৌলমী বিরক্ত হয়ে তাকায়। সেই যুবক তখন তার সহকর্মীকে বলে, "দাদা, আপনি অযথা রাগ করবেন না। দিদিমনি আপনার রিক্শাকে অপমান করেন নি। উনি হাতে টানা রিক্শায় চড়েন না। আমাদের কষ্ট হয় ভেবে।"
মৌলমী রাগে ফেটে পড়তে চায়। নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে বলে, "আপনি কী করে এত কথা জানলেন শুনি! আমি কি আপনাকে সে কথা কখনো বলেছি? আশ্চর্য তো!"
সেই যুবক তখন সুযোগ পেয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে মৌলমীর তাকে ছাড়া আর কোন উপায় নেই এখন। মুখে বিজয়ের হাসি নিয়ে বলে, "তো, কী করতে চান এখন বলুন! আমি ছাড়া কিন্তু আর কেউ নেই যে আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। আমি যেতে পারি। তবে ডবল টাকা দিতে হবে। আর সেই টাকা আগেভাগে এখুনি দিয়ে দিতে হবে। আপনার ভয়ের মাশুল আবার আমার ভয়ের মাশুলও বলতে পারেন।"
মৌলমী ভুরু কুঁচকে জিগেশ করে, "আপনার কীসের ভয়? সেটা আবার কেন?"
যুবকটি বাঁকা হাসি হেসে উত্তর দেয়, "বাড়ির গেটে পৌঁছে গিয়ে এই যাত্রায় বেঁচে গেছেন ভেবে আমাকে পয়সা না দিয়েই দৌড়ে যদি চলে যান! তখন? তখন আমাকে আঙুল চুষতে হবে। আমি ডাকলেও আর সাড়া দেবেন না। উল্টো আমি তখন মহিলা যাত্রীকে নির্যাতন করছি ভেবে লোকে পেটাবে।"
মৌলমী কোনো রকমে হাসি চেপে রাখে। ভালোই হলো। সেও ভয় পাবে তাহলে। বেশী কিছু টাকা গেলেও ক্ষতি নেই। এদিকে কারেন্ট গেলে সহজে আসেনা আর। মৌলমী টাকা হাতে তুলে দিয়ে বলে, "আমাকে ভালোয় ভালোয় পৌঁছে দিলে আমি আরও তিরিশ টাকা দেব বাড়ি গিয়ে।"
রিক্শা চলতে আরম্ভ করে। মৌলমী পাশে হাঁটে। চালক মাঝে মাঝে অহেতুক ঘন্টা বাজায় – টুংটুংটুং। কেরোসিনের আলোটা টিমটিম করে জ্বলে। কারো মুখে কথা নেই।
হঠাৎ সেই যুবক নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে, "আপনি আপনার ব্যাগটা তো অন্তত রিক্শায় রাখতে পারেন। এতে আমার বিশেষ কিছু কষ্ট হবে না তেমন!"
মৌলমী চমকে উঠে হঠাৎ করে যেন কোন মন্ত্রবলে রিক্শাওয়ালা যুবকটির কথা শোনে। হাতের ব্যাগটা রিক্শায় রাখে। কেন যে অফিসের পর বাজার করতে গেছিল! না হলে এই লোডশেডিঙের কবলে পড়তে হত না। অনেক আগেই বাড়ি পৌঁছে যেত।
চালক তখন গুন্গুন্ করে গান ধরেছে। মৌলমী একটু বিরক্ত হয়। বলে, "গানটা না গাইলে চলত না?"
– আমার সুর এতই খারাপ লাগছে? আমি তো ভাবলাম আপনার ভয়টা এতে করে কাটবে একটু। ভয়ে যে মরছেন সেটা তো আমি বুঝতেই পারছি। বেশ তাহলে কথাই বলুন না হয়। আপনি প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'সংসার সীমান্তে' পড়েছেন?"
মৌলমী অন্ধকারে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে! রিক্শা চালক এরকম একটা প্রশ্ন করে বসবে বলে সে কল্পনায়ও ভাবতে পারেনি। আমতা আমতা করে বলে, "না। কেন?"
– এমনিই জিগেশ করলাম। জানতে ইচ্ছে হল। আমি গতকাল পড়লাম। বেশ ভালো লেগেছে গল্পটা।
– আপনি কি সব সময় বই পড়েন?
– যখন সময় পাই। বেঁচে থাকার লড়াইয়েই তো বেশীর ভাগ সময়টা চলে যায়। আপনি বই পড়েন না?
– খুব একটা না। সেই অভ্যেস হয়ে ওঠেনি।
– জানেন, বইয়ের মতো শত্রু আর কেউ নেই। সবাই যে বলে বই হল গিয়ে বন্ধু, সেটা একদম সত্যি নয়।
মৌলমী কথা খুঁজে পায় না। এরকম উদ্ভট কথা আগে কখনো শোনে নি। তাই চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে করে কিছু না বলে হাঁটতে থাকে। ভাবে,পথ কখন ফুরোবে!
– কী, ভালো লাগল না তো আমার কথাটা! তাই না?
মৌলমী এবার খানিকটা বিরক্ত হয়েই উত্তর দেয়, "এমন অদ্ভুত কথা আগে কখনো শুনিনি। বই যদি শত্রুই হবে তবে পড়েন কেন শুনি?"
– আরে রাগ করেন কেন? শত্রু বলেই তো পিছু ছাড়ে না। বন্ধু হলে তো কবেই চলে যেত। তাছাড়া শত্রু বলেই তো যা মনে আসে তা বলে দেয়। বন্ধু হলে তো এখন এটা তখন সেটা বলে বেড়াতো। বই কিন্তু সকালেও যা, বিকেলেও তাই। আবার ওই মাঝরাতেও একই রকম।"
যুক্তি শুনে মৌলমীর হাসি পায়। কী বলবে ভেবে পায়না। তবুও কিছু তো বলতে হবে। না হলে আবার এর জবাবদিহি করতে হতে পারে। তাই কিছু না ভেবেই বলে, "আপনি অনেক ভাবেন, তাই না?"
– নানা, ভাবাভাবির কিছু নেই এই সংসারে। যা মনে আসে তাই বলি।
– আচ্ছা, আপনি কী করে জানলেন, আমি রিক্শা চড়তে পছন্দ করিনা? আমাকে বলবেন?
– আমি সব যাত্রীকে দেখি কে কখন আসে। কে অটো চড়ে। কে রিক্শা
চড়ে। কে আবার হেঁটে যায়। আমি আপনাকে কখনো রিক্শা চড়তে দেখিনি। আপনি হয় অটো নয়তো হেঁটেই চলে যান। কিন্তু আমাদের দিকে ঠিক তাকান। একটা মায়া ভরা চাওনি। কোথাও যেন কষ্ট হচ্ছে এমন কিছু সেই চাউনিতে ভেসে ওঠে। তাই আন্দাজে বলেছি। কি, মিলে গেল তো?
– আপনি বেশ কথা বলতে পারেন তো!
– এটাও ওই শত্রুর জন্য। ওই যে বললাম, বই হল আমার শত্রু!
মৌলমী এবার সত্যিই হেসে ওঠে। বাড়ির কাছে এসে পড়েছে। কথায় কথায় রাস্তা শেষ হয়ে গেছে। এতক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকলেও এখন মনে হচ্ছে রাস্তাটা আরও একটু লম্বা হলেই যেন ভালো হত। মৌলমী হেসে বলল, "এসে গেছি।"
– যাক বাবা, দেহে প্রাণ ফিরে পেলেন তাহলে!
– এই নিন আপনার টাকা যা দেব বলেছিলাম।
– না, এই টাকা আমি নেব না। আমার যা পাওনা তা আগেই মিটিয়ে দিয়েছেন।
– কেন, আমার কথা আমাকে রাখতে হবে তো!
– কথা তো এমনও হতে পারত আপনি আমাকে বলছেন ভিতরে আসতে। এক কাপ চা খেয়ে যেতে। তা কি কখনো হয়? আমি রিক্শা-চালক। তাই আমার কাছে আপনার কথা না রাখলেও চলবে। আমি বরং এই টাকা নিলে গিল্টি ফীল করব। যান বাড়ি যান। ভিতরে গিয়ে বিশ্রাম করুন।
মৌলমী চমকে ওঠে! কী ভীষণ সত্যি কথাগুলো। ঠিকই তো। সে কি পারবে ওকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে এক কাপ চা খাওয়াতে? কক্ষনো না। সুট-বুট পরা কেউতো নয়। একজন রিক্শা-চালককে কি হঠাৎ করে ভিতরে নিয়ে আসা যায়? মৌলমী মৃদুস্বরে বলে, "আপনিও সাবধানে যাবেন। স্টেশনে দেখা হবে।"
রিক্শা-চালক তার রিক্শা ঘুরিয়ে নেয়। শব্দ করে, টুংটুংটুং।
মৌলমী তাকিয়ে থাকে সেই দিকে। চালকের হাতের আলোটা কেঁপে কেঁপে উঠে কি যেন বলতে চায় মৌলমীকে।
(পূর্বে প্রকাশিত, 'ঋ এবং' - অগাস্ট ২০২৪)